ছবি:- সঞ্চিতা হাজরা
কবিরুল ইসলাম,
কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান: ভারত কেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালিত হলো কাটোয়া মহকুমার সংহতি মঞ্চে। কাটোয়া মহকুমা প্রশাসন এবং মহকুমা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রশাসনিক আধিকারিক, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং শহরের বিশিষ্ট গুণীজনদের উপস্থিতিতে এক স্মরণীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীন ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রনায়ক ও দেশপ্রেমিক ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন, আদর্শ এবং দেশের প্রতি তাঁর অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাটোয়ার বিধায়ক কৃষ্ণ ঘোষ, কাটোয়ার মহকুমাশাসক রিনা ঘোষ (আইএএস), মহকুমা পুলিশ আধিকারিক কাশীনাথ মিস্ত্রি, মহকুমা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিক সুস্মিতা মুখার্জী, কাটোয়া পৌরসভার নির্বাহী আধিকারিক, পৌরসভার প্রধান আধিকারিক-সহ শহরের বিশিষ্ট গুণীজন ও বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানের সূচনায় অতিথিরা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। এরপর প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।
স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অসামান্য শিক্ষাবিদ, দক্ষ সংগঠক, দূরদর্শী চিন্তাবিদ এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, জাতীয় ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক চেতনাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে কাজ করার জন্য তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানান বক্তারা।
অনুষ্ঠানে ছিল সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পর্ব। ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি, অঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রতিটি পরিবেশনায় উঠে আসে দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা এবং ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনাদর্শ। প্রতিযোগিতায় কৃতী প্রতিযোগীদের হাতে সম্মাননা ও পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা। ছাত্রছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং দর্শকদের উৎসাহ অনুষ্ঠানে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে।
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বাংলার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তি উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং মাতা ছিলেন যোগমায়া দেবী। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং দেশপ্রেমের আদর্শে বড় হয়ে ওঠেন। ছাত্রজীবনে তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একাধিক বিষয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যারিস্টারিও সম্পন্ন করেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি ভারতীয় শিক্ষাজগতে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে উচ্চশিক্ষার প্রসার, গবেষণার উন্নয়ন, ভারতীয় সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার মর্যাদা বৃদ্ধিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যা আজও শিক্ষাক্ষেত্রে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের শিল্পোন্নয়ন, স্বনির্ভর অর্থনীতি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাঁর নেওয়া নানা উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। তবে দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরে ১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে ভারতের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতার প্রশ্নে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমগ্র ভারতবর্ষের জন্য এক সংবিধান, এক জাতীয় পতাকা এবং সমান আইন থাকা উচিত। জম্মু ও কাশ্মীরে পৃথক সাংবিধানিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করে তিনি ঐতিহাসিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁর সেই আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্দোলনের সময় তিনি কাশ্মীরে গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন বন্দি অবস্থায় রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর অকাল প্রয়াণে দেশ এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ককে হারায়। কিন্তু তাঁর আদর্শ, চিন্তাধারা এবং দেশের প্রতি আত্মত্যাগ আজও কোটি কোটি ভারতবাসীর কাছে প্রেরণার উৎস।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ তাঁর জীবন কেবল রাজনীতির ইতিহাস নয়, শিক্ষা, সংস্কৃতি, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার্ঘ্য।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়। উপস্থিত অতিথি, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষের উৎসাহ ও অংশগ্রহণে ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর এই আয়োজন এক স্মরণীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। শ্রদ্ধা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও দেশপ্রেমের এক অপূর্ব সমন্বয়ে কাটোয়ার সংহতি মঞ্চে পালিত এই অনুষ্ঠান ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনদর্শন ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল এবং তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশগঠনের অঙ্গীকার গ্রহণের বার্তা তুলে ধরল।

