লাইফস্টাইল
উৎসবের আলোয় মানবিকতার দীপশিখা
নিজস্ব সংবাদদাতা, কাটোয়া: উৎসব মানেই আনন্দ, উৎসব মানেই মিলন। আর সেই আনন্দের সঙ্গে যখন মিশে যায় মানবিকতার স্পর্শ, তখন উৎসব হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ। উৎসবের দিনগুলিতে রক্তের জোগান স্বাভাবিক রাখতে এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করল বীর ফিজিক্যাল একাডেমী। পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার আখড়া গ্রামের বামুনপাড়ায় আয়োজিত এই শিবিরে রক্তদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও এলাকার মানুষের উৎসাহে এক অনন্য মানবিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বীর ফিজিক্যাল একাডেমীর কর্ণধার রামতনু মণ্ডল জানান, এবছর এলাকার পাঁচজন ছাত্রছাত্রী পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে চাকরিতে যোগ দিয়ে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তাঁদের এই সাফল্যকে স্মরণীয় করে রাখার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দিতেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত সাফল্যের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই আনন্দের সঙ্গে সমাজের কল্যাণও যুক্ত হয়। সেই ভাবনা থেকেই উৎসবের আনন্দকে মানুষের জীবন বাঁচানোর মহৎ কাজে উৎসর্গ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎসবের মরশুমে বিভিন্ন ব্লাড সেন্টারে রক্তের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। সেই সময় রক্তের জোগান সচল রাখা এবং মুমূর্ষু রোগীদের প্রয়োজনে রক্তের জোগান নিশ্চিত করতে এই ধরনের শিবিরের গুরুত্ব অপরিসীম। বীর ফিজিক্যাল একাডেমীর এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি রক্তদান শিবিরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
এই মহতী উদ্যোগকে সফল করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় দাঁইহাট ব্লাড ডোনার অ্যাসোসিয়েশন এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল ভলান্টারি ব্লাড ডোনার্স সোসাইটি। শিবিরে মোট ২১ জন স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। সংগৃহীত রক্ত পাঠানো হয় কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালের হেমরাজ ব্লাড সেন্টারে। রক্তদাতাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থাকলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষই মানবিক উদ্যোগে শামিল হতে পারেন। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে চাকরিতে যোগ দেওয়া এলাকার পাঁচজন কৃতী ছাত্রছাত্রীকে সংবর্ধনা প্রদান। তাঁদের সাফল্যকে সম্মান জানিয়ে বীর ফিজিক্যাল একাডেমীর পক্ষ থেকে প্রত্যেকের হাতে স্মারক সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। তাঁদের এই সাফল্য এলাকার অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদেরও আগামী দিনে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
অন্যদিকে, স্বেচ্ছায় রক্তদানকে উৎসাহিত করা এবং সমাজসেবামূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ বীর ফিজিক্যাল একাডেমীর কর্ণধার রামতনু মণ্ডলের হাতে স্মারক সম্মাননা তুলে দেয় ওয়েস্ট বেঙ্গল ভলান্টারি ব্লাড ডোনার্স সোসাইটির কাটোয়া মহকুমা ইউনিট। রক্তদান আন্দোলনের দীর্ঘদিনের কর্মী তথা রক্তবন্ধু জয়দেব দত্ত তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। পাশাপাশি, সমাজসেবা ও রক্তদান আন্দোলনে সহযোগিতার স্বীকৃতি হিসেবে বীর ফিজিক্যাল একাডেমীর পক্ষ থেকেও দাঁইহাট ব্লাড ডোনার অ্যাসোসিয়েশনকে স্মারক সম্মান প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দাঁইহাট দমকল কেন্দ্রের আধিকারিক রাহুল মণ্ডল, রক্তদান আন্দোলনের দীর্ঘদিনের কর্মী রক্তবন্ধু জয়দেব দত্ত, প্রদীপ চ্যাটার্জী-সহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও গুণীজনেরা। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অনুজ ব্যানার্জী। রক্তদান, সমাজসেবা এবং এলাকার কৃতী সন্তানদের সম্মান জানানোর এই সম্মিলিত প্রয়াসে একদিকে যেমন মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে, অন্যদিকে তেমনই আরও সুদৃঢ় হয়েছে সামাজিক বন্ধন। বীর ফিজিক্যাল একাডেমীর এই উদ্যোগ বুঝিয়ে দিয়েছে, উৎসবের প্রকৃত আনন্দ শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সেই আনন্দের ভাগ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে তার প্রকৃত সার্থকতা।
এক ফোঁটা রক্ত যেমন বাঁচাতে পারে একটি প্রাণ, তেমনই একটি মানবিক উদ্যোগ জাগিয়ে তুলতে পারে হাজারো মানুষের মনে সেবার প্রেরণা। উৎসবের আবহে বীর ফিজিক্যাল একাডেমীর এই রক্তদান শিবির তাই হয়ে উঠল মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক সুন্দর নিদর্শন। আগামী দিনেও এই ধরনের উদ্যোগ আরও বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করবে এবং সমাজে মানবিকতার বার্তাকে আরও সুদূরপ্রসারী করে তুলবে—এমনটাই আশাবাদী উদ্যোক্তা ও সহযোগী সংগঠনগুলি।